“নব্বইয়ের দশক : সময় যেখানে কাব্য হয়ে বেঁচে আছে “
আম্মার হুসাইন
সময় কখনো শুধু ঘড়ির কাঁটা নয়, কখনো তা একেকটা রঙিন ক্যানভাস, যার মধ্যে আঁকা থাকে শৈশবের হাসি-কান্না, গ্রামবাংলার মাঠ-ঘাট আর মানুষের মায়া। নব্বইয়ের দশক যেন বাংলাদেশের এক সোনালি প্রজন্মের নাম, যে প্রজন্ম এখনো বুকভরা আবেগ নিয়ে বলতে পারে—আমাদের দিনগুলো ছিলো সত্যিই আলাদা।
খাতা কলমে আমরা দুই হাজারের প্রজন্ম হলেও, নব্বইয়ের সেই সোনালি দিনগুলোর ছোঁয়া আমরা পেয়েছি গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে। ভোর হলে দূরে কারও মোরগের ডাক ভেসে আসতো—“কুঁকড়ুকু, কুঁকড়ুকু”—সেই ডাকেই ভাঙতো আমাদের ঘুম। শীতকালে কুয়াশা ঢাকা মাঠ পেরিয়ে দাদুর হাত ধরে মক্তবে যাওয়া, কিংবা ছোট্ট হাতে কোরআনের কলম ধরা—সে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
স্কুল জীবনে আমাদের আনন্দের শেষ ছিলো না। হাই বেঞ্চের ওপর কলম খেলা, টিফিনের সময় দল বেঁধে পালানো, আর সন্ধ্যা হলে বই খাতা বুকে নিয়ে মাস্টার মশাইয়ের বাড়ি যাওয়া—এসব ছিল আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু পড়াশোনার চেয়ে বেশি টান ছিল মাঠে। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই ব্যাগ ছুঁড়ে ফেলে ছুটতাম খোলা মাঠে। হাডুডু, গোল্লাছুট, সাত ভাই চম্পা, খড়ের গাদায় লুকোচুরি—কত যে খেলা ছিল! তখনকার খেলার নিয়ম ছিল না মোবাইল অ্যাপে, ছিল বুকের ভেতরকার উচ্ছ্বাসে আর মাটির গন্ধে।
শীতের সকালের স্মৃতি তো ভোলার নয়। খড়কুটো জ্বালিয়ে সবাই মিলে আগুন পোহানো, ধোঁয়ার গন্ধে ভিজে থাকা জামাকাপড়, আর দাদুর গল্পে জমে ওঠা সকাল। ঘরে ঘরে নবান্নের পিঠাপুলির আয়োজন, শীতের সকালে গরম ভাপার পিঠার গন্ধ—এসব আজও যেন জিভে লেগে আছে। বছরের নির্দিষ্ট দিনে দাদুর হাত ধরে হালখাতা নিতে যাওয়া ছিল উৎসবের মতো।
গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে তখনো যুক্ত ছিল অনেক বিশ্বাস আর কুসংস্কার। যেমন, গ্রামে প্রচলিত ছিল—রোদ-বৃষ্টি একসাথে হলে খেকশিয়ালের বিয়ে হয়। বাচ্চারা তখন চোখ বড় বড় করে আকাশের দিকে তাকিয়ে খুঁজতো সেই রহস্যময় বিয়ের দৃশ্য। বৃষ্টির দিনে আমরা কাগজের নৌকা ভাসাতাম, ভেতরে দিয়াশলাইয়ের কাঠি বসিয়ে ভাবতাম এটা যেন আমাদের নিজের জাহাজ। বইয়ের পাতার ভেতরে ময়ূরের পালক রেখে বিশ্বাস করতাম, ভোরে সেটা ডিম পাড়বে। এসব সরল বিশ্বাসের মধ্যে কত যে আনন্দ, কত যে কল্পনা লুকিয়ে ছিল!
সন্ধ্যা নামলে হেরিকেনের টিমটিম আলোয় বসে পড়াশোনা করতাম। বাইরে ঝিঝিপোকার ডাক, দূরে শিয়ালের হুক্কাহুয়া, আর ভেতরে আমাদের পড়ার সুর—সবকিছু মিলিয়ে এক অদ্ভুত সুরেলা আবহ তৈরি করতো। দুপুরবেলা গাছতলায় কোকিলের ডাক, বর্ষায় ব্যাঙের ডাকে ভরে যাওয়া চারপাশ—এসবের ভেতর দিয়েই কেটেছে আমাদের শৈশব।
কিন্তু সেই সোনালি দিনগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে গেছে। এখনকার প্রজন্মের কাছে মাঠ মানে শুধু ফুটবল বা ক্রিকেট নয়, মোবাইলের পর্দায় ফ্রি ফায়ার আর পাবজি। হেরিকেনের আলোতে বই পড়া নয়, আজকের শিশুদের চোখ ঝলমল করে মোবাইলের নীল আলোয়। মোরগের ডাক শোনার আগে তারা অ্যালার্মে জাগে, দাদুর গল্প শোনার বদলে ইউটিউবের শর্টস দেখে সময় কাটায়।
আমাদের সময়ে ছিল প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক। সকাল-বিকেলের ডাক, ঋতুর রঙ, খেলার আনন্দ, মিলেমিশে থাকার বন্ধন—এসব আজকের প্রজন্মের হাতে নেই। তাদের কাছে সবকিছুই কৃত্রিম, মেশিনের ভেতর বন্দি। তাই মনে হয়, তারা যেন কিছু না পেয়েও অনেক কিছু পেয়েছে। কিন্তু আসলে তারা হারিয়েছে সেই সোনালি আনন্দ, সেই প্রাকৃতিক আবহ, সেই শৈশবের অমূল্য স্বাদ।
আজ যখন পেছনে তাকাই, তখন মনে হয়—আমরা আসলে এক সৌভাগ্যবান প্রজন্ম, যারা অন্তত নব্বইয়ের সেই সোনালি রোদ্দুরে, কুয়াশার চাদরে আর গ্রামবাংলার অপরূপ প্রকৃতিতে শৈশব কাটাতে পেরেছি। সেই দিনগুলো আর ফিরবে না, কিন্তু স্মৃতির পাতায় তারা আজীবন ঝলমল করে থাকবে।
লেখক: আম্মার হুসাইন, ছাত্র, পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়



আপনার মতামত লিখুন
Array